মেজিয়ার শিকল-বাঁধা উমা ও তার কাহিনী

0
135


মা তাদের বাড়ির চঞ্চল মেয়ের মতো। বাড়ির চাতালে সারাক্ষন দৌড়ে দৌড়ে বেড়ান। আর এই চঞ্চল মেয়েকে এক জায়গায় রাখার জন্যই এক সময় শিকল বাঁধা হয়েছিল তার বেদিতে। কয়েক যুগ পেরিয়ে গেলেও মেজিয়ার পাল বাড়িতে আজও মা দূর্গা বাঁধা পড়েন শিকলে। বংশ পরম্পরায় আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই প্রথা। পুজোর দিনগুলো মার দুরন্তপনা কমাতেই তাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়।

বাঁকুড়ার মেজিয়ার পাল বাড়ির এই পূজো এলাকার মানুষদের কাছে ‘শিকল বাঁধা দূর্গা’ নামেই পরিচিত। পাল পরিবার সুবর্ণ বনিক সম্প্রদায়ের। তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন হুগলীর চন্দননগরের বাসিন্দা। বহু আগে পাল পরিবারের পূর্বপুরুষেরা দামোদর নদ দিয়ে নৌকা পথে বানিজ্য করতে বর্তমান রানীগঞ্জের মেজিয়া এলাকায় আসতেন। এমনি একদিন বানিজ্য করতে এসেই তারা বর্গি আক্রমনের মুখে পড়ে নিজেদের বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাঁকুড়া জেলার মেজিয়ায়। তারপর থেকে মেজিয়ায় পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন পাল পরিবার।

পাল পরিবারের এক সদস্য থেকে জানা যায় তাদের এক পূর্বপুরুষ গোবিন্দ পাল কোন এক সময় এই দূর্গা পূজার সূচনা করেণ। বানিজ্য, গালার কারবার ও দেবোত্তর সম্পত্তির দরুন আর্থিক অবস্থা খুব ভালোই ছিল। আর্থিক স্বাচ্ছলতার কারণে পূজোর দিনগুলিতে বাড়িতে নহবতের আসর বসত এছাড়া এত ধুমধাম করে পূজো হত যা তাক লাগিয়ে দিত সবাইকেই। সময়ের সাথে সাথে এখন আগের সেই আড়ম্বর না থাকলেও বাড়ির সদস্যরা আগের মতোই নিয়ম মেনে পূজো করে থাকেন। প্রতি বছর দূর্গা পূজার জন্য বাড়ির সব সদস্যরা এক সাথে পাল বাড়ির দালানে এসে উপস্থিত হন। পূর্বপুরুষদের দেখানো নিয়ম মেনেই বৈষ্ণব মতে উমার আরাধনা হয়ে থাকে।

পাল পরিবারের বিশ্বাস সারা বছরই উমা বাড়ির দালানে খেলে বেড়ান। পূজার কদিন মা দূর্গার দূরান্তপনা আটকানোর জন্যই পূর্বপুরুষেরা শিকল বেঁধে রাখেন। পরিবারের সদস্য পেশায় হ্যোমিওপ্যাথি ডাক্তার আলোকরঞ্জন পাল জানান, “বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে অনেকেই এসব কথা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। তবে আমি দাদুর মুখে শুনেছি কোনও এক বছর অষ্টমীতে পূজো চলাকালীন হঠাৎ করেই চঞ্চল হয়ে ওঠেন মা। নড়তে শুরু করে মায়ের বেদী। সবাই মিলে ধরে, প্রার্থনা করে তাঁকে শান্ত করা হয়। সেই সময় থেকেই মায়ের আসনের পাটাতন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় দেওয়ালের একটি আংটার সঙ্গে”। আগের মত আড়াম্বনার সঙ্গে পূজো না হলেও এখনও প্রতি বছর পূর্বপুরুষদের দেখানো নিয়ম মেনেই পূজো হয়ে থাকে পাল বাড়িতে। পূজোর কদিন আত্মীয় পরিজন, বন্ধু বান্ধব, ও প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন পাল বাড়ির সদস্যরা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে