সাগর শুকিয়ে আজ মরুভূমি, বিলুপ্ত জনজীবন

0
213

Priyanka Pal, DNI: কাজাকিস্তান ও উজবেকিস্তানের মাঝে ৬৮,০০০ বর্গ কিলোমিটার মিষ্টি জলের হ্রদ ছিল। আকারে বিশাল হওয়ায় এই হ্রদ এক সময় ‘অ্যারাল সাগর’ নামে চিহ্নিত হত। বিশ্বের চতুর্থ বিশালতম হ্রদ ছিল অ্যারাল সাগর। এর মাঝে এক সময় দ্বীপ সংখ্যা ছিল ১,১০০টি। হ্রদের বুকে ভেসে বেড়াত অজস্র জাহাজ, প্রমোদতরী ও মাছ ধরার নৌকা। তবে এ সবই এখন ইতিহাস। এখন তা বিস্তৃত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

জানা গিয়েছে, ষাটের দশক থেকেই একটু একটু করে শুকোতে শুরু করেছিল অ্যারাল সাগর। প্রাকৃতিক কোনও কারণে শুকাতে শুরু করেনি। অবক্ষয় শুরুর কারণ ছিল তত্‍কালীন সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান জোসেফ স্তালিনের সেচ নীতি ব্যবস্থা।  সেই সময় কৃষিকাজে জলের জোগান দিতে অ্যারাল সাগরের উত্‍স একাধিক নদীর উপর বাঁধ তৈরি করে সোভিয়েত প্রশাসন। এর জেরে হ্রদে জলের জোগান কমতে শুরু করে। এছাড়া জলাশয়টির মধ্যে জঞ্জালও ফেলা হতো। ফলে মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে হ্রদ শুকিয়ে গিয়ে যায়। তৈরি হয়ে যায় একটা ধু ধু মরুভূমি।

মূল হ্রদটি শুকিয়ে প্রথম অবস্থায় চারটি ছোট হ্রদে পরিণত হয়। ২০০৯ সালে দক্ষিণ-পূর্ব অংশের জলাধারটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় এবং ২০১৪ সালে নাসা-র উপগ্রহ চিত্র থেকে জানা গিয়েছে, অ্যারাল সাগরের পূর্ব প্রান্তটিও শেষ পর্যন্ত উধাও হয়ে গিয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য তো নষ্ট হয়েছেই। পাশাপাশি সংকটে পড়ছেন এই অঞ্চলের মানুষেরা। একদা হ্রদের তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা মূলত মত্‍স্যজীবী ছিলেন।

গ্রামের সবার জীবিকাই ছিল মাছ ধরা। কিন্তু তারা যেখানে মাছ ধরতেন, ১৯৭০ সাল থেকে সেখানকার জল শুকিয়ে যেতে শুরু করে আর মাছও হারিয়ে যায়। গত চল্লিশ বছরে ষাটহাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের আর প্রায় ৪০ মিটার গভীরের হৃদটি যেনো আচমকাই গায়েব হয়ে যায়। লেকের চিহ্ন হিসাবে শুধুমাত্র ১০% আয়তনের একটি জলাধার রয়েছে। এই ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের একটি কারণ বলে ধরা হয়। জলের চিহ্ন টুকুও নেই এখন। দেখলে শুধু চোখে পড়বে বিস্তৃত মরুভূমি। 

একসময়ে অ্যারাল লেক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক-পঞ্চমাংশ মাছের যোগান হতো। লেকের তীরের মাটিতে তরমুজ, গমের মতো ফসল ফলতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে যেতে শুরু করে আর ঘাস মরে যায়। এখন আর সেখানে ফসলও হয় না। এখন বালির উপর বেশ কয়েকটি বিশাল আকারের মাছ ধরার নৌকা, জাহাজ পরিত্যক্ত ভাবে পড়ে রয়েছে। দুরে, যতদূর চোখ যায়, এরকম আরও জাহাজ দেখা যাবে।

প্রাচীন কালে সাগর বেশ উর্বর ছিল এবং সেখানে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী এবং গাছপালা ছিল যেগুলি ভালো অবস্থায় বাস করত। এই সমুদ্রটি ছিল অসংখ্য উপকরণ এবং প্রজাতির মাছের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীরও বাস। আজ, কিছু প্রজাতির মাছের প্রভাব যা এখনও রক্ষিত রয়েছে, তাদের বেশিরভাগ অদৃশ্য হয়ে গেছে।

অ্যারাল সাগরে জীববৈচিত্র্য বেশ কিছু বছর ধরে প্রায় নেই বললেই চলে। সমুদ্র ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেছে। আর তার সাথে সাথে এই নদীতে বসবাসকারী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীজ হ্রাস পেয়েছে। কেবল জলের পরিমাণ হ্রাস না হওয়ায় জীবিত প্রজাতির কম অস্তিত্বের পরিণতি ছিল, তবে জলের উচ্চ লবণাক্ততাও ছিল।

১৯৬০ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এশিয়ার সেই অঞ্চলের সমস্ত শুষ্ক সমতলকে তুলার উৎপাদন করার ক্ষমতা রাখার একটি অঞ্চলে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা তৈরি করে। এটি করার জন্য, বিভিন্ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল যা অ্যারাল সাগরে জলের পরিমাণকে কম করে তোলে।

তুলা শিল্পের সাথে অনেক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে অ্যারাল সাগর শেষ হয়ে গিয়েছিল। উচ্চ মূল্য চোকাতে হয়েছিল এই সাগরকেই। দ্রুত হারে সমুদ্রের জলের পরিমাণ সঙ্কুচিত হচ্ছিল। দ্বীপগুলি উপদ্বীপ বা অবিচ্ছিন্ন জমির অংশে পরিণত হয়েছিল। জলের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে সমুদ্রের লবণাক্ততা আরও বেশি বেড়েছে। জলের আয়তন হ্রাস কেবল অ্যারাল সাগরের উপরই প্রভাব ফেলেনি, বরং এটি দূষণের পাশাপাশি লবনতার পরিমাণও বৃদ্ধি করেছিল।

হঠাৎই এই পরিবেশগত অবস্থার পরিবর্তন উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের জন্য মারাত্মক অভিযোজন সমস্যা তৈরি করেছিল। তারা এই নতুন অভিযোজনে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে আসতে আস্তে মাছ এভাবেই অদৃশ্য হতে শুরু করে। ফিশিং এবং সামুদ্রিক শিল্প হ্রাস পেয়েছে। সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল ছিলেন বহু মানুষ। মাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় তাদের জীবন ও জীবিকায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করে।

যদিও এই সমুদ্রকে উদ্ধারের জন্য অসংখ্য প্রচেষ্টা করা হয়েছে। উজবেকিস্তান এবং ইউএনএ যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে কিভাবে তার পুনরুদ্ধার সম্ভব তার এখনও হদিশ মেলেনি। আশা করা যায়, এক না একটা সময় আবার ফিরে পাওয়া যাবে সেই প্রাচীন অ্যারাল সাগর। সমাজ ব্যবস্থা, মানুষের প্রয়োজন একটা গোটা হ্রদ বুজিয়ে দিল যা আজকের শতকে দাঁড়িয়ে বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সময়ের বদলের সাথে সাগর যে শুকিয়ে বিলীন হয়ে যায় অ্যারাল সাগর তার প্রতীক হিসেবে থেকে যাবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে