Durgapuja: রায় বাড়ির বনেদিয়ানায় দশমীতে ব্যাঘ্রদেবতার পূজো

0
120



বাংলায় দূগোৎসব বনেদি বাড়ির পূজো ছাড়া চিরকালই অসম্পূর্ন। যতই থিম বা ক্লাবে ক্লাবে সেরা পূজোর লড়াই হোক না কেণ। বনেদি বাড়ির পূজো এক আলাদাই ঐতিহ্য বহন করে। তেমনি হাওড়া আন্দুলের মৌরির রায় পাড়ার রায় বাড়ির পূজো এক অন্যতম বনেদিয়ানার পূজো। প্রায় কয়েকশো বছর ধরে রায় বাড়িতে দূর্গাপূজো হয়ে আসছে। সেই আগের ঐতিহ্য মেনে এখনো ঠিক একইভাবে পূজো হয়।

পূর্ববঙ্গ থেকে বহুকারনে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলায় আসেন তাঁরা। কোথায় যাবেন কোন ঠিক ছিল না। এমন সময় বজরায় হঠাৎ করে রায় পরিবারের এক ভাই বাবুরাম কুশারীর স্ত্রীর প্রসব বেদনা ওঠে। সামনে ঘাট দেখে সেখানেই বজরা থামান বাবুরাম। যেখনে বজরা থামে তার নাম আন্দুল। সপরিবারে সেখানেই নামেন তারা। কন্যা সন্তানের জন্ম দেন বাবুরামের স্ত্রী। পরে সেখানেই সপরিবারে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রায় পরিবার। তাঁরা ছিলেন পিরালি ব্রাহ্মণ। মহেশ্বর বটব্যাল ছিলেন পেশায় শাঁখারি, হুগলীর হরিপাল থেকে রায় বাড়িতে শাঁখা ও শঙ্খ বিক্রি করতে আসতেন তিনি। সৎ ও পরিশ্রমী মহেশ্বর কে ছেলে হিসেবে খুব পছন্দ হয় বাবুরামের। নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মহেশ্বরকে ঘর জামাই বানান তিনি। পরে সময়ের সাথে সাথে সেই মহেশ্বরই বড় জমিদার হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ সরকার মহেশ্বরকে দেন ‘রায়’ উপাধি। সেই থেকেই তাঁর উত্তরসূরিরা রায় উপাধি ব্যাবহার করে থাকে।

রায় বাড়ির সদস্য রণদীপ রায় জানান পূজোর সমস্ত নিয়ম পূর্বপুরুষদের দেখানো রীতি মেনেই হয়ে থাকে এখনো। নব পত্রিকা স্নানের পর প্রতিষ্ঠা থেকে সন্ধিপূজো, দূর্গাপুজোর সমস্ত বিধীই পালিত হয় সনাতনী রীতি মেনে। রায় বাড়ির ঠাকুরদালানেই প্রতি বছর প্রতিমা গড়া হয়। অতিমারির প্রকোপে সেই রীতিতে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিমার কিছুটা কাজ বাইরে থেকে করে এনে বাকি কাজ কুমোর ঠাকুর দালানে সম্পূর্ন করেছেন। প্রতিমা গড়া হয়ে গেলে বাড়ির খুদে সদস্যরা মার হাতে পিতলের অস্ত্র তুলে দেয়। সিন্ধুক থেকে দেবী দূর্গার সমস্ত গয়না বের করে এনে সাজিয়ে তোলা হয় মাকে। রায় বাড়িতে দেবীর সামনে বলি দেওয়া সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। পূজোর কটা দিন বাড়িতে কোন রকম আমিষ ঢোকে না দশমী পর্যন্ত মাকে নিরামিষ ভোগই উৎসর্গ করা হয়। দশমীর ঘট বিসর্জনের পর তবে আমিষ খান বাড়ির সকলে। প্রতি বছর দূর্গা পূজোয় রায় বাড়িতে পাত পরে প্রায় ১২০ জনের। দেশ বিদেশ থেকে রায় পরিবারের সকল আত্মীয় দূর্গা পুজোর জন্য আন্দুলের আদী বাড়িতে এসে মিলিত হন। প্রতি বছরই দূর্গোৎসব রায় পরিবারের সমস্ত সদস্যকে এক সূত্রে বাঁধে।

রায় পরিবারের পূজোর একটি বিশেষ বৈচিত্র্য আছে যা রায় পরিবারের দূর্গা পূজোকে বাকি বনেদি বাড়ি থেকে সম্পূর্ন আলাদা করে। বিজয়া দশমী তিথীতে মা দূর্গার ভাসানের পর এখানে ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণরায়কে পূজো করা হয়। ঠাকুর দালানে না বাড়ির বাইরের মাঠে দক্ষিণরায়ের পূজো করা হয় প্রতিবছর। নীলষষ্ঠীতে আর দশমীর দিন দুদিন পূজো করা হয় ব্যাঘ্রদেবতাকে। আবার পূজো শেষে দক্ষিণরায়কে ঝুড়ি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। সারা বছরই বাড়ির দালানে দক্ষিণরায়কে ঝুড়ি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। কেণ তাকে সারা বছর ঝুড়ি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়? রায় বাড়ির সদস্যরা জানান কোনও কালে এ বাড়ির এক কর্তা দক্ষিণরায়ের মন্দির নির্মানের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু যত বারই মন্দির তৈরির কাজ হচ্ছিল ততবারই অর্ধনির্মিত মন্দির ভেঙে পড়ছিল। তাই বাড়ির সদস্যরা মনে করেন দক্ষিণরায়ই নিজের মন্দির চাইছেন না। তারপর থেকেই মন্দির তৈরির কাজ বন্ধ হয় এবং ব্যাঘ্রদেবতা থেকে যান বাড়িতেই। এছাড়া হঠাৎ বনেদি বাড়ির দূর্গাপূজোয় ব্যাঘ্রদেবতার পুজোর কারণ বাড়ির সদস্যরা জানান, এক কালে এলাকায় প্রচুর বাঘের উপদ্রব ছিল। তাই বাঘের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সুন্দরবনের লৌকিক দেবতা দক্ষিণরায়ের পূজো করে থাকতেন পূর্বপুরুষেরা। রায় বাড়িতে তাই পরিবারের পরম্পরা মেনে আজও ব্যাঘ্রদেবতার পূজো হয়ে থাকে।

News By Tania

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে